ওয়াল স্ট্রিট থেকে গত মঙ্গলবার একদিনে উধাও হয়ে গেছে বিনিয়োগকারীদের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে দীর্ঘদিনের মিত্রদের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়ার প্রতিক্রিয়ায় ওই দিন ধস নামে মার্কিন শেয়ারবাজারে। এর পর পরই এ শুল্ক আরোপের হুমকি থেকে সরে আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াল স্ট্রিটের ধস এক্ষেত্রে অন্যতম বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বাজারে বিনিয়োগকারীরাও এখন বিভিন্ন ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম পদক্ষেপ সৃষ্ট অনিশ্চিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে সামনের দিনগুলোয় বাজারে ট্রাম্পের এ ধরনের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় বড় ধরনের কোনো উত্থান-পতন নাও দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা। খবর এফটি।
বিনিয়োগকারীদের জন্য গত মঙ্গলবার ছিল ২০২৫ সালের এপ্রিলে লিবারেশন ডে শুল্ক ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ দিন। যদিও ওইদিন বাজার থেকে ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে ‘খুবই ছোট ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা গত এক বছর শেয়ারবাজার থেকে যে মুনাফা করেছেন, তার তুলনায় এ পতন কিছুই না। তবে পরদিন বিকালেই যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও অন্যান্য দেশের ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা বাতিল করেন তিনি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান ম্যান গ্রুপের প্রধান বাজার কৌশলবিদ ক্রিস্টিনা হুপারের মতে, ‘অবশ্যই শেয়ারবাজারে কী ঘটছে, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সংবেদনশীল। এ সিদ্ধান্ত সেটিকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।’
করপে’র প্রধান বাজার কৌশলবিদ কার্ল শ্যামোটার মতে, ‘গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপকে শাস্তি দেয়ার হুমকিতে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পের জন্য একটি সংকেত। এটি ছিল তার জন্য একটি আঘাত।’
এ ঘটনার পর ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নতুন প্রবচনের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে। সেটি হলো ‘ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেনস আউট’ বা ‘ট্যাকো’ রেসপন্স’। চরম প্রতিক্রিয়ার মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পিছু হটার বিষয়টিকেই নতুন এ প্রবচনের মধ্য দিয়ে সামনে নিয়ে আসছেন তারা। নিউইয়র্কে এ প্রবচনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে যেকোনো ইস্যুতে হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি দেখে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হবেন না। বরং তার ধৈর্যের সীমা আন্দাজ করতে চেষ্টা করবেন।
নাইনটি ওয়ানের পোর্টফোলিও ম্যানেজার জেসন বোবরা-শিন বলেন, ‘ট্যাকো ধারণাটি এখন বাজারে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিত যে ট্রাম্প বারবার নেকড়ের ভয় দেখিয়ে সবাইকেই এর সঙ্গে অভ্যস্ত করে তুলছেন। কিন্তু ভয়ের বিষয় হলো এ নেকড়ে একদিন সত্যি সত্যিই অপ্রত্যাশিতভাবে চলে আসতে পারে।’
তবে এ ‘ট্যাকো’ প্রবচন নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করছেন হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র কুশ দেশাই। তিনি বলেন, ‘চুক্তি না মানলে ট্রাম্প সত্যি সত্যি পদক্ষেপ নেবেন কিনা, সে বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকলে নিকোলাস মাদুরো বা ইরানকে জিজ্ঞেস করলেই হবে।’
লিবারেশন ডে ঘোষণার পর বাজার অস্থিরতার মধ্যে বিনিয়োগকারীরা বেশ আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। শুল্কবিবাদ ও বাণিজ্য যুদ্ধের ব্যাপকতা তাদের চমকে দেয়। মার্কিন শেয়ারবাজার ও ট্রেজারি বাজারে এর প্রভাবও দেখা যায়। বিনিয়োগকারীদের সম্পদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে সে সময় বাজার যত দ্রুত পড়ে যায়, এর পুনরুদ্ধারও হয় তত দ্রুতগতিতে।
পিকটেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান কৌশলবিদ লুকা পাউলিনির মতে, ‘ওই সময়ের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য হলো ট্রাম্পের রাজনৈতিক মূলধন (পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল) এখন অনেক কম। মধ্যকালীন নির্বাচনের সময় আসছে, তাই তার ধৈর্যের সীমাও অনেক ক্ষীণ।’
বিষয়টি ট্রাম্পের হুমকিতে থাকা দেশগুলোকে সাহায্য করতে পারে বলেও মনে করেন অ্যালাইয়েন্স গ্লোবাল ইনভেস্টরসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মাইকেল ক্রাউটজবার্গার। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ইউরোপীয় সরকারের উপদেষ্টা হলে বলতাম, বাজারে একটু অস্থিরতা তৈরি করা দরকার। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প বাজারের ওঠানামা নিয়ে খুবই চিন্তিত। এতে রাজনীতিবিদদের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।’
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির ধরনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন বিশ্বের অন্যান্য স্থানের বিনিয়োগকারীরাও। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এ ধরনের ঘোষণা সাধারণত এমন একসময় আসে, যখন শেয়ার, বন্ড ও মুদ্রাবাজারে স্বাভাবিক লেনদেন বন্ধ থাকে। সুইস ব্যাংক সিজের সিআইও চার্লস-হেনরি মনচাউ গোটা বিষয়টিকে ‘ট্রাম্প শুল্ক চক্রের সময়রেখা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গড়ে চার-ছয় সপ্তাহ এ চক্র চলে। শুরুতে শেয়ারবাজার সূচক কমে ও অস্থিরতা বাড়ে, এরপর মার্কিন কর্মকর্তাদের আশ্বাস ও সমাধানের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তা শেষ হয়।
মনচাউ বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এবারের চক্রের সময়কাল অনেক ছোট ছিল। কারণ হয়তো এতে প্রত্যেকের জন্য ঝুঁকি বা ক্ষতির আশঙ্কা অনেক বেশি।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুলাইয়ে ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে বরখাস্তের কথা ভাবছেন বলে প্রথম উল্লেখ করেন। সে সময় ডলারের বড় ধরনের অবমূল্যায়ন ঘটে। এর একদিন পরই ট্রাম্প জানান, জেরোম পাওয়েলকে বরখাস্তের কোনো পরিকল্পনা নেই তারা। তখন মুদ্রাটি আবার ঘুরে দাঁড়ায়।
কোনো কোনো বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া না দেখানোর বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন। গ্রিনল্যান্ড সংকটের সময় সরকারি বন্ডের এক বিনিয়োগকারী জানিয়েছিলেন, বিষয়টি নিয়ে যেকোনো খবর থেকে সচেতনভাবেই নিজেকে দূরে রেখেছেন তিনি। এছাড়া একাধিক বাজারে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিদের অনেকেই এখন ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা ঘটা বা উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বক্তব্য আসার লক্ষণ দেখামাত্র বিনিয়োগের কিছু অংশ বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর পরিবর্তে সেই বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ ও অন্যান্য পণ্যে স্থানান্তর করছেন তারা। কারণ অনিশ্চিত সময়েও এসব সম্পদ থেকে মুনাফার নিশ্চয়তা থাকে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণার পর স্বর্ণের দাম ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায়। কিন্তু তিনি পিছু হটলেও আউন্সপ্রতি দাম এরই মধ্যে ৫ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।